Breaking News

পুকুর চুরি নয়, এ যেন সাগর চুরি

দেশে যে দুর্নীতির মচ্ছব চলছে, নতুন করে বলার কিছু নেই। প্রতিদিনই গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে তা জানা যাচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি উন্নয়নকাজে যে ধরনের দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে তা অবিশ্বাস্য বললেও কম বলা হয়।

সরকারি কেনাকাটায় একেকটি পণ্যের দর দেখলে চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। আগে বিপুল অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় বলা হতো পুকুর চুরি। এখন ব্যাপকতা বোঝাতে তা বদলে বলতে হচ্ছে ‘সাগর চুরি’।

কয়েক বছর আগে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের বালিশকাণ্ড, ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজে পর্দাকাণ্ড বেশ আলোচিত হয়। এবার একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজার পৌরসভার প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পে। একেকটি বিজলি বাতির দাম ধরা হয়েছে ৭০ হাজার টাকা! এই দাম অত্যধিক বললেও কম বলা হয়; এক কথায় হাস্যকর। দাম শুনে খোদ পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, ‘আমি বিস্মিত, হতভম্ব ও চিন্তিত।’

নয়া দিগন্তের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, কক্সবাজার পৌরসভা এলাকার রাস্তায় ‘এলইডি বাতি সরবরাহ ও স্থাপনের মাধ্যমে আধুনিকায়ন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের জন্য দেয়া হয়। প্রকল্পের প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছে, পর্যটন শহর কক্সবাজারে প্রতিদিন দেশী-বিদেশী হাজারো পর্যটক আসেন। নিরবচ্ছিন্ন নাগরিকসেবা দিতে এবং সেবার মান উন্নয়নে পর্যাপ্ত আলোক ও নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন। তাই আধুনিক ও বিদ্যুৎসাশ্রয়ী এলইডি সড়কবাতি কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। খরচের হিসাব থেকে জানা গেছে,

প্রস্তাবনায় প্রতিটি ১০০ ওয়াট এলইডি লাইটের দাম ধরা হয়েছে ৬৯ হাজার ৬৯০ টাকা। এ ছাড়া প্রতিটি ৪০ ওয়াট এলইডি লাইট ৩১ হাজার ৯৭১ টাকা, প্রতিটি ৬০ ওয়াট ৫৫ হাজার ৩২১ টাকা এবং প্রতিটি ৮০ ওয়াট ৬৬ হাজার ৬৯৭ টাকা ধরা হয়েছে; কিন্তু এসব লাইটের দর নির্ধারণ করা হয়েছে কোনোরকম বাজার যাচাই ছাড়াই। কৌতূহলোদ্দীপক হলো, প্রকল্পে গাড়ি কেনার প্রস্তাব না থাকলেও পেট্রল, অয়েল ও লুব্রিকেন্ট বাবদ ব্যয় চাওয়া হয়েছে।

চীনা বিভিন্ন কোম্পানির ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, কোম্পানি ও লাইটের মান ভেদে প্রতিটি সেটের দাম ১২ ডলার থেকে সর্বোচ্চ ১৭৮ ডলার পর্যন্ত রয়েছে; যা স্থানীয় টাকায় ৮৫ টাকা হিসাবে ডলারের বিনিময় মূল্য ধরলে সর্বনিম্ন এক হাজার ২০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ১৩০ টাকা হয়। চীনের জংসান ইয়াই লাইটিং কোম্পানির প্রতিটি সেটের দর ৩২ দশমিক ৫ থেকে ৮৪ দশমিক পাঁচ ডলার । হাংজুয়া টেকনোলজির প্রতিটি ওয়াটার প্রুফ এলইডি সেটের দাম ১২ থেকে ৬৫ ডলার পর্যন্ত।

এ ছাড়া ইয়াংজু বেস্টার্ন ইন্টার. ট্রেডিং কোম্পানির সোলার এলইডি ওয়াটার প্রুফড সেটের দাম ২০ থেকে ১৫০ ডলার। এগুলো সাড়ে ৭ থেকে ৪২০ ওয়াটের। এ ছাড়া ইয়াংজু ইয়াংফেং নিউ এনার্জি টেকনো. কোম্পানি লিমিটেডের ১৪৮ থেকে ১৭৮ ডলার। এ দিকে সিএন সরবরাহকারীর তথ্য অনুযায়ী সেটসহ ৬০ ওয়াটের প্রতিটি লাইটের দাম সর্বোচ্চ ২৯৮ ডলার বা বাংলাদেশী টাকায় ২৫ হাজার ৩৩০ টাকা। এদের সর্বনিম্ন দর ৮৫ ডলার।
বিধি মতে, ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প থাকলে সেসবের অনুমোদনের ক্ষমতা পরিকল্পনামন্ত্রীর। এর বেশি হলে একনেকে উপস্থাপন করা বাধ্যতামূলক।

২৫ কোটি টাকা ব্যয়ের কোনো উন্নয়ন প্রকল্প থাকলে সেখানে সম্ভাব্যতা যাচাই করাও আবশ্যিক। উন্নয়নকাজ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে যাচাই হয়ে পরিকল্পনা কমিশনে যায়। মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যাচাইয়ের সময় কিভাবে এই কাণ্ড চোখে এড়িয়ে যায়? পরিকল্পনা কমিশনেইবা কিভাবে অনুমোদন পায়? উন্নয়নকাজের এসব অসঙ্গতি দেখে বলা যায়, দুর্নীতির একটি শক্তিশালী বলয় মহীরুহ হয়ে আমলাতন্ত্রের পরতে পরতে গেড়ে বসেছে। ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ বেপরোয়াভাবে লোপাট করা হচ্ছে।

Check Also

গলায় খাবার আটকে মেয়ের মৃত্যুর পর মা-বাবার আত্মহত্যা

খাওয়ার সময় হঠাৎ গলায় খাবার আটকে যায় ১৮ মাস বয়সী শিশুকন্যার। অনেক চেষ্টা করেও খাবার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *